নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নজর পড়তে শুরু করেছে। এরই
অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক
কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের সফর অনেকটাই ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ)
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক
কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন সৌজন্য সাক্ষাৎ নতুন কিস্তির ছাড় পাওয়ার ক্ষেত্রে আশার আলোর
সঞ্চার করেছে। সভায় আইএমএফের স্থগিত থাকা ঋণচুক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা
গেছে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) ঢাকায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে,
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশা প্রকাশ করেছেন, সব ঠিক থাকলে আগামী জুলাই
মাসে ঋণের এই কিস্তি পাওয়া যেতে পারে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইএমএফের
ঋণপ্রদান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি নির্বাচিত সরকারের
সঙ্গে আলোচনা করে কিস্তি ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যদিও কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ
বাস্তবায়নের শর্ত ছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হলে এবং
বিএনপি সরকার একমত হওয়া শর্ত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলে বাংলাদেশ জুনের মধ্যে
ডিসেম্বরের বাকি থাকা কিস্তিসহ ঋণের ১.৩০ বিলিয়ন ডলার পাবে।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেল আমদানি করতে বাংলাদেশ আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ
বিভিন্ন সংস্থা থেকে অতিরিক্ত ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা চেয়েছে বলে সম্প্রতি
জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর। এই সময়ে আইএমএফের ঋণের কিস্তি
পাওয়ার বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারির এক চিঠিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বলেছে, শিগগিরই
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসতে চলেছে আইএমএফ। তাদের কর্মসূচির আওতায় দেশে কী কী
সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং তা কতটা সফল, মূলত সেই বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা
হবে। পাশাপাশি নতুন সরকারের সঙ্গে আগামী দিনেও ধারাবাহিকভাবে সহযোগিতা বজায় রাখার
বার্তা দিতে চায় আইএমএফ।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব আদায়ের
লক্ষ্যমাত্রাসহ আইএমএফের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এখনো পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
এর পাশাপাশি অমীমাংসিত কাজের তালিকায় রয়েছে আরও কিছু বিষয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য
হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পুনর্গঠন, বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও বেশি স্বাধীনতা
দেওয়া এবং বিদেশি মুদ্রার ক্ষেত্রে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করা।
করোনা মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে চরম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল।
সেই প্রেক্ষাপটে গত ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ
চুক্তিতে সই করে বাংলাদেশ।
এই চুক্তির আওতায় রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার, ব্যাংকিং অবকাঠামোর পুনর্গঠন ও সরকারি
ভর্তুকি কমানোর মতো একাধিক শর্ত রাখা হয়েছিল। পরে গত বছরের জুনে এই কর্মসূচির মেয়াদ
আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়। সেই সঙ্গে বাড়তি ৮০০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করে আইএমএফ। ফলে
মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার।
এখনো পর্যন্ত পাঁচটি কিস্তিতে মোট ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ২০২৩
সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪৭৬.৩ মিলিয়ন ডলার, ওই বছরের ডিসেম্বরে ৬৮১ মিলিয়ন ডলার, ২০২৪
সালের জুনে ১.১৫ বিলিয়ন ডলার ও ২০২৫ সালের জুনে ১.৩৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ এখনো ১.৮৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পাওয়া বাকি।
গত ডিসেম্বরেই আইএমএফের আর একটি কিস্তির টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচিত
সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরেই তা ছাড় করা হবে বলে ঋণপ্রদান স্থগিত রাখা হয়।
গত অক্টোবরে ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠক বসে। সেখানে তৎকালীন
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে
আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচিত প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর পরবর্তী কিস্তির
টাকা দেওয়া হবে।
আইএমএফের ঋণপ্রদান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের পর গত নভেম্বরে সালেহউদ্দিন
জানিয়েছিলেন, নির্বাচিত সরকার ঠিক কতটা আর্থিক সহায়তা চাইতে পারে, তা নিয়েও
সংস্থাটি সঙ্গে আলোচনা করবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের
(আইএমএফ) কাছ থেকে পরবর্তী কিস্তি হিসেবে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার বিষয়ে আগামী
এপ্রিলে সংস্থাটির বোর্ড সভায় চূড়ান্ত আলোচনা হবে। সব ঠিক থাকলে আগামী জুলাই মাসে
ঋণের এই কিস্তি পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। গতকাল সচিবালয়ে সফররত
আইএমএফ-এর এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের সঙ্গে বৈঠক শেষে
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানিয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, আইএমএফের ঋণ ছাড়ের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ১ দশমিক ৩
বিলিয়ন ডলার কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে জুলাই মাসে রিভিউ হবে। এর মধ্যেই আমরা বাজেটের
প্রস্তুতি নেব। এপ্রিলে ওয়াশিংটনে আইএমএফের ‘স্প্রিং মিটিং’ আছে, সেখানে এ বিষয়ে
চূড়ান্ত আলোচনা হবে।
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান কর্মসূচিগুলো পুনরায় পর্যালোচনা হবে জানিয়ে
মন্ত্রী বলেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। আইএমএফের যে শর্ত বা রিকোয়ারমেন্টগুলো রয়েছে,
তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে আইএমএফের সব শর্ত এখনই বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন অর্থমন্ত্রী
বলেন, এখন কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব আর বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে
যেগুলো এখন সম্ভব নয়, সেগুলো ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। অর্থনীতি এখন যে
জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে সবকিছু আমাদের মতো করেই করতে হবে।
বৈঠক শেষে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন
সাংবাদিকদের বলেন, ঋণ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে
আলোচনা হয়েছে এবং আরও আলোচনা হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির রিভিউ হবে।
























