সাময়িক যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়ার
প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য
প্রস্তুত নয় বলেই মনে করে ইরান। তাই কেবল সাময়িক কোনো চুক্তির ভিত্তিতে তারা এই
গুরুত্বপূর্ণ জলপথের অবরোধ তুলে নেবে না।
পাকিস্তানের দ্বি-স্তরীয় শান্তি পরিকল্পনা
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে পাকিস্তান একটি দুই
ধাপের শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো দ্রুত
শত্রুতা বন্ধ করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই রুটটি সচল করা।
পরিকল্পনার প্রথম ধাপে রয়েছে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। দ্বিতীয় ধাপে থাকবে
একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানোর কার্যক্রম।
পাকিস্তানের এই প্রস্তাব ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষের কাছেই হস্তান্তর করা
হয়েছে। রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে, সোমবার এই চুক্তির প্রাথমিক বিষয়গুলো চূড়ান্ত করে
একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা ছিল। পাকিস্তান বর্তমানে এই আলোচনার একমাত্র
মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
ইরানের অবস্থান ও শর্ত
ইরানি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে তারা পাকিস্তানের প্রস্তাবটি পেয়েছেন এবং তা
পর্যালোচনা করছেন। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা চাপের
মুখে তারা সিদ্ধান্ত নিতে রাজি নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সম্ভাব্য এই চুক্তির মূল ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল— ইরান পারমাণবিক
অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত থাকবে। বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক
নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং বিদেশে জব্দ করা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা হবে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র একটি স্থায়ী সমাধানের চেয়ে পরিস্থিতি
সাময়িকভাবে শান্ত রাখতে বেশি আগ্রহী। স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ওয়াশিংটনের সদিচ্ছার
অভাব রয়েছে বলেই মনে করছে তেহরান। ফলে, স্থায়ী কোনো নিশ্চয়তা ছাড়া হরমুজ প্রণালি
খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ।
বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে
এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব
পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হুমকি দিচ্ছেন ট্রাম্প
তেহরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে ইরানের ওপর চরম বিপর্যয় নামিয়ে আনার
হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের
বিশেষ বাহিনীর প্রশংসাও করেছেন।
ট্রাম্প একদিকে চরম বিপর্যয়ের হুমকি দিলেও অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছে বলে
জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক
মধ্যস্থতাকারী কয়েকটি দেশ ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি
নিয়ে আলোচনা করছে।
সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ইরানের অনেক ভেতরে ঢুকে
উচ্চঝুঁকির এক অভিযান চালিয়ে নিখোঁজ মার্কিন বিমানসেনাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইরানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও
বিমান হামলা চালাচ্ছে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে
পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। নৌপথে জ্বালানি
পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ তেল ও
প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।
গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প অশালীন ভাষায় ইরানকে হরমুজ
প্রণালি খুলে দিতে হুমকি দেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রায় পাঁচ সপ্তাহ ধরে ইরান
গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ
সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানের জন্য মঙ্গলবার হবে পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে এবং ব্রিজ
ডে—সব একসঙ্গে।’
এখানে ‘পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে’ ও ‘ব্রিজ ডে’ বলে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও
পরিবহন অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকি দিয়েছেন। এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের চরম
লঙ্ঘন হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
পোস্টে ট্রাম্প আরও লেখেন, ‘সেখানে এমন কিছু হবে না! …হরমুজ প্রণালি খুলে দিন…,
না হলে আপনাদের নরকের ভেতর বসবাস করতে হবে, শুধু দেখুন! সকল প্রশংসা আল্লাহর
জন্য’—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন অনলাইন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা
হয়, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক কয়েকটি মধ্যস্থতাকারী দেশ ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য
৪৫ দিনের একটি যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করছে। এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের পথ তৈরি করতে পারে।
এ আলোচনার বিষয়ে জানা আছে, এমন মার্কিন, ইসরায়েলি ও আঞ্চলিক চারটি সূত্রের বরাত
দিয়ে অ্যাক্সিওস এ খবর দিয়েছে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে এই
প্রতিবেদন যাচাই করতে পারেনি। হোয়াইট হাউস এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ
বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের অনুরোধে তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দেয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারীরা দুই ধাপের একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে।
প্রথম ধাপ হবে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি; দ্বিতীয় ধাপ হবে যুদ্ধ শেষ করার একটি চুক্তি।
সেদিন ফক্স নিউজকে ট্রাম্প নিজেও ইরানের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা বলেছিলেন। যুদ্ধ
পরিস্থিতি নিয়ে এমন মিশ্র বার্তা যুদ্ধের সমর্থকবিরোধী ও আর্থিক বাজারকে বিভ্রান্ত
করছে।
এদিকে ওয়াশিংটনের মিত্র ইসরায়েলও ইরানের ওপর চাপ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে। গত
শনিবার দেশটি ইরানের একটি বড় পেট্রোকেমিক্যাল প্রতিষ্ঠানে হামলা করে। তেহরানের ওপর
চাপ আরও বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ইসরায়েল আগামী সপ্তাহে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে
হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে
জানিয়েছেন দেশটির এক জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা।

























