আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ব্যক্তি পর্যায়ে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৫
লাখ টাকা নির্ধারণের জোরালো প্রস্তাব করেছে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সমুন্নত রাখা, করের পরিধি বৃদ্ধি এবং একটি প্রকৃত
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট সুপারিশ
পেশ করা হয়েছে। বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)
এবং এফবিসিসিআই-এর ৪৬তম পরামর্শক কমিটির সভায় এই প্রস্তাবনাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে
উত্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাণিজ্য
মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের উপস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন
এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে
বাংলাদেশের উত্তরণের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে প্রবৃদ্ধির ধারা সচল রাখতে সময়োপযোগী
রাজস্ব নীতির ওপর বিশেষ জোর দেয় এফবিসিসিআই। কর সংক্রান্ত সুপারিশে সংগঠনটি সাধারণ
নাগরিকদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ এবং নারী ও প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে তা
সাড়ে ৫ লাখ টাকা করার অনুরোধ জানিয়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন
প্রতিষ্ঠানের করপোরেট করহার ২৭.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা
হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ২০ থেকে ২২ শতাংশে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংগঠনটি।
ব্যবসায়িক ব্যয় লাঘবের লক্ষ্যে ন্যূনতম কর হার ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা
এবং পর্যায়ক্রমে তা সম্পূর্ণ বিলুপ্তির প্রস্তাব দিয়েছে এফবিসিসিআই।
আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর ২ শতাংশের পরিবর্তে ১ শতাংশ নির্ধারণ এবং
স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ইলেকট্রনিক ইনভয়েসিং ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে
সংগঠনটি। সরকারের ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার
লক্ষ্যের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করে রাজস্ব প্রশাসনে আধুনিকায়ন ও দক্ষতা
বৃদ্ধির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও তদারকি
জোরদার করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে
সংগঠনটি। পাশাপাশি বিদেশে অর্থ পাচার রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পাচারকৃত
সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।
রপ্তানি বাণিজ্যের সক্ষমতা ধরে রাখতে তৈরি পোশাকসহ সকল রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য
আগামী পাঁচ বছর উৎসে কর ০.৫০ শতাংশে স্থির রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ক্ষুদ্র
রপ্তানিকারকদের স্বার্থে একটি কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউস নির্মাণ এবং এক্সপোর্ট
ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইডিএফ) পরিধি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের এই শীর্ষ
সংগঠন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো ইউটিলিটি সার্ভিসে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশও করা
হয়েছে। একইসাথে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সুদের হার কমানোর পাশাপাশি
ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৃথক লার্জ এবং মিডিয়াম ট্যাক্সপেয়ার ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব
দেওয়া হয়েছে।
আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে রূপান্তর এবং
পরবর্তী পাঁচ বছরে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রার কথা পুনরায়
ব্যক্ত করেছে এফবিসিসিআই। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বয়স্ক, বিধবা ও
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও
ভাষা শিক্ষার মতো আধুনিক খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বৈদেশিক শ্রমবাজার দখলের তাগিদ দেওয়া
হয়েছে। ব্যবসায়ীদের এই প্রস্তাবনাগুলো বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন
করবে বলে আশা করা হচ্ছে। মূলত একটি স্বচ্ছ, আধুনিক এবং ব্যবসাবান্ধব কর ব্যবস্থা
গড়ে তোলার মাধ্যমেই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করছে এফবিসিসিআই।
























