হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল না হলেও ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত
যুক্তরাষ্ট্র। এ কথা জনিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার এক
বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট
জার্নাল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ
জলপথটিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রশাসন সূত্রের খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা মনে করছেন হরমুজ প্রণালি
জোরপূর্বক উন্মুক্ত করতে গেলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে। ট্রাম্পের লক্ষ্য হলো চার
থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে এই সংঘাত শেষ করা। তাই তিনি বর্তমান সামরিক অভিযানকে ইরানের
নৌ-শক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছেন।
ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সামরিক অভিযান কমিয়ে এনে কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে
তেহরানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলাচল স্বাভাবিক করতে বাধ্য করা হবে। তা না হলে ইউরোপ
ও উপসাগরীয় মিত্রদের দিয়ে পরবর্তীতে প্রণালি খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনি সতর্ক করে বলেছেন, প্রণালি খুলে না
দিয়েই সামরিক অভিযান শেষ করা ‘চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন’ সিদ্ধান্ত হতে পারে। তার কথায়,
‘জ্বালানি বাজার বৈশ্বিক। প্রণালি বন্ধ থাকার ফলে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, তা
থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব নয়।’
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধাক্কা
খাবে। কারণ, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবহন হয়। এরই মধ্যে
জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বহু দেশ চাপে পড়েছে, আর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০
ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
গত এক মাস ধরে ট্রাম্প এই সংকটের সমাধান নিয়ে ক্রমাগত দ্বিধাবিভক্ত মন্তব্য করে
আসছেন। কখনো তিনি বেসামরিক জ্বালানি স্থাপনায় বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন, আবার কখনো
বলেছেন এই প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি এটিকে
অন্যান্য দেশের সমস্যা হিসেবে দেখছেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ
প্রণালি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে কাজ করছে, তবে এটি তাদের বর্তমানে মূল সামরিক
লক্ষ্যগুলোর তালিকায় নেই।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, বর্তমান সামরিক লক্ষ্যগুলো
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পূরণ হবে। এরপর হরমুজ ইস্যুতে হয় ইরান নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে,
নয়তো যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক জোট তা নিশ্চিত করবে।
তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ইচ্ছা দেখালেও অঞ্চলটিতে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েই চলেছে
যুক্তরাষ্ট্র। নতুন করে সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি বিমানবাহী রণতরী ও দ্রুত
মোতায়েনযোগ্য বাহিনী পাঠানো হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, হরমুজ প্রণালি এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর জন্য বেশি
গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওয়াশিংটন এখন মিত্র দেশগুলোকে (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা
ইত্যাদি) এই জলপথ পাহারায় নেতৃত্ব দিতে উৎসাহিত করছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪০টি
দেশ এই পথে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে, সামরিক শক্তি প্রয়োগের চেয়ে তেহরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ
সৃষ্টি করেই শেষ পর্যন্ত একটি রফায় আসা সম্ভব হবে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, হরমুজ
প্রণালি দ্রুত সচল না হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও প্রযুক্তি পণ্যের সংকট আরও ঘনীভূত হতে
পারে।

























