দেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি
নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ কর-সংক্রান্ত প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন
অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)।
বুধবার (১ এপ্রিল) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান
বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ডিবিএর প্রস্তাবগুলো কার্যকর হলে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ও
টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়বে,
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদার হবে, যা সামগ্রিক
অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর উৎসে কর কেটে নেওয়ার পর
আবার আয়কর রিটার্নে কর দিতে হয়। ফলে কার্যকর করহার অনেক ক্ষেত্রে ৪০.৫ শতাংশে পৌঁছে
যায়। এতে স্পন্সর-পরিচালকদের মধ্যে নগদ লভ্যাংশ ঘোষণায় অনীহা তৈরি হচ্ছে এবং উচ্চ
সম্পদশালী বিনিয়োগকারীরাও লভ্যাংশভিত্তিক বিনিয়োগ থেকে সরে যাচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে
ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশের ওপর উৎসে কাটা করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য
করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে কর কাঠামো সহজ হয় এবং দ্বৈত করের চাপ কমে।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতে কর বৈষম্য দূর করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে ডিবিএ। বর্তমানে কর
রেয়াত সুবিধা পেতে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ সীমা থাকায় খুচরা বিনিয়োগকারীরা
নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এই সীমা তুলে দিয়ে যেকোনো পরিমাণ বিনিয়োগকে কর রেয়াতের আওতায়
আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে এবং বাজারে স্থিতিশীল
তহবিল প্রবাহ নিশ্চিত হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে মূলধনী আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ করহার থাকলেও মিউচুয়াল ফান্ডসহ
অন্যান্য সিকিউরিটিজে ভিন্ন করহার প্রযোজ্য হওয়ায় বিনিয়োগে অসাম্য তৈরি হয়েছে। এই
পার্থক্য দূর করে সব তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ ও ফান্ড ইউনিটের জন্য অভিন্ন করহার
নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শেয়ার লেনদেনের টার্নওভারের ওপর কাটা উৎসে কর (টিডিএস) বর্তমানে মিনিমাম ট্যাক্স
হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় লোকসান হলেও ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে কর দিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি
পরিবর্তনের জন্য টিডিএসকে মিনিমাম ট্যাক্স না ধরে অ্যাডভান্স ট্যাক্স হিসেবে গণ্য
করার প্রস্তাব দিয়েছে ডিবিএ, যাতে প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে কর সমন্বয়ের সুযোগ থাকে এবং
কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
লোকসানগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের পুনর্বাসনে নেগেটিভ ইকুইটি অ্যাকাউন্টে কর ছাড় দেওয়ার
প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। ইন্টারেস্ট ওয়েভার, ক্যাশ ডিভিডেন্ড এবং ক্যাপিটাল গেইনের
ওপর পূর্ণ কর অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান ১০ লাখ টাকার সীমা তুলে দেওয়ার
সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা আবার সক্রিয়ভাবে বাজারে ফিরতে
পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
বড় কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়াতে ‘ডিমড-টু-বি লিস্টেড কোম্পানি’ কাঠামো চালুর প্রস্তাব
করা হয়েছে। নির্দিষ্ট মূলধন, টার্নওভার বা ব্যাংক ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই
কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহে
উৎসাহ দিতে নীতিগত প্রণোদনার সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিষ্ক্রিয় তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর সুবিধা বাতিলের
প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি। যেসব কোম্পানি টানা তিন বছর বার্ষিক সাধারণ সভা করেনি বা
লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি, তাদের ক্ষেত্রে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির সমান করহার
নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
ডিবিএর মতে, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও গভীরতা বাড়বে,
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে এবং সার্বিকভাবে বাজারে আস্থা ফিরে আসবে।

























