যুক্তরাজ্য প্রবাসী সমকামী অধিকার কর্মী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট দৃষ্টি দে-র বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রচারণা চালিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটি সারাদেশে ব্যাপক পোস্টারিং কার্যক্রম পরিচালনা করে তার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বাতিল এবং মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের ব্লগার, মানবাধিকার কর্মী এবং সুশীল সমাজের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
রাজধানী ঢাকা, নড়াইল, খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, যশোর এবং দেশের আরও অসংখ্য ছোট-বড় শহরে গত সপ্তাহ থেকে এই পোস্টারিং ও জনসংযোগ কার্যক্রম চোখে পড়ছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, সংগঠিত এবং পরিকল্পিতভাবে এই প্রচারণা পরিচালিত হচ্ছে।
পোস্টারে তীব্র ভাষায় লেখা ছিল: “দেশ, সমাজ তথা ইসলামের শত্রু, আল্লাহর গজবপ্রাপ্ত, সমকামী, ব্যভিচারকারী, নাস্তিক ব্লগার, মুরতাদ, মালাউন দৃষ্টি দে-এর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বাতিল করে প্রকাশ্যে ফাঁসি দাও, দিতে হবে।”
পোস্টারগুলোতে হেফাজতে ইসলামের লোগো এবং স্থানীয় নেতাদের নাম উল্লেখ থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কোনো সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের কর্মীরা এই প্রচারণাকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, নাস্তিক্যবাদ এবং সমকামিতার পক্ষে কথা বলা ব্যক্তিরা ইসলামের শত্রু এবং তাদের শাস্তি প্রয়োজন।
ঢাকার মিরপুর এলাকার একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “গত সপ্তাহ থেকে আমাদের এলাকায় এরকম পোস্টার দেখা যাচ্ছে। রাতের বেলা কিছু লোক এসে পোস্টার লাগিয়ে যাচ্ছে। পরদিন সকালে দেখি দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি, দোকানের শাটার সব জায়গায় পোস্টার লাগানো।”
খুলনার একজন সাংবাদিক জানান, “আমাদের এলাকায়ও একইভাবে এই পোস্টার প্রচারণা চলছে। শুধু দেয়ালে নয়, রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বাসস্ট্যান্ডে, মার্কেটের সামনে সর্বত্র এই পোস্টার দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে একটা সংগঠিত অভিযান চলছে।”
রাজশাহীর একজন মানবাধিকার কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটি শুধু পোস্টার প্রচারণা নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত ভীতি প্রদর্শনের কৌশল। যারা ভিন্নমত পোষণ করেন, যারা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা।”
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন। একাধিকবার চেষ্টার পরও তিনি এই বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছেন।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, দৃষ্টি দে দীর্ঘদিন যাবৎ যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন এবং সেখান থেকে সমকামী অধিকার, ধর্মীয় মৌলবাদ, নারীবাদ, মানবাধিকার এবং বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে সোচ্চার থেকেছেন। তিনি তার নিজস্ব ব্লগ, ‘অধার্মিক’ ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে নিয়মিত লেখালেখি করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে মতামত প্রকাশ করেন।
তার লেখায় এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের অধিকার, বাংলাদেশে সমকামিতা বৈধকরণ, ধর্মনিরপেক্ষতা, ইসলামী মৌলবাদের সমালোচনা, নারীর সমঅধিকার এবং ধর্মীয় সংস্কারের মতো বিষয় প্রাধান্য পায়। এসব বিষয় বাংলাদেশের রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীর তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য ইসলামী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে দৃষ্টি দে-সহ একাধিক ব্লগারের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননা, নাস্তিক্যবাদ প্রচার এবং সমকামিতার পক্ষে প্রচারণার অভিযোগ এনে তাদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছে। এর আগেও একাধিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে সংগঠনগুলো।
হেফাজতে ইসলামের একজন স্থানীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যারা ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলে, যারা সমকামিতার মতো পাপাচার প্রচার করে, তাদের বাংলাদেশে থাকার অধিকার নেই। এটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে ইসলামবিরোধী কার্যক্রম আমরা বরদাশত করব না।”
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং অধিকার সংস্থাগুলো এই পোস্টার প্রচারণাকে সহিংসতার প্ররোচনা এবং ব্যক্তির জীবনের প্রতি প্রকাশ্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, “কাউকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া এবং নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি জানানো গুরুতর অপরাধ। কর্তৃপক্ষের উচিত এর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।”
আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী কাউকে হত্যার হুমকি এবং সহিংসতার প্ররোচনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই পোস্টারগুলো স্পষ্টভাবে আইনের লঙ্ঘন। পুলিশ এবং প্রশাসনের উচিত দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা নীরব থাকছে।”
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং ব্লগাররা এই পোস্টার প্রচারণাকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আক্রমণ বলে উল্লেখ করেছেন। একজন অনলাইন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটি শুধু দৃষ্টি দে-র বিরুদ্ধে নয়, এটি আমাদের সবার বিরুদ্ধে একটি হুমকি। যারা ভিন্নমত প্রকাশ করে, যারা প্রগতিশীল চিন্তা করে, তাদের সবাইকে ভীত করার চেষ্টা।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই পোস্টার প্রচারণার ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং দেশে-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকে এটিকে ঘৃণা প্রচার এবং সহিংসতার প্ররোচনা বলে নিন্দা জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার নামে এই ধরনের কার্যক্রমকে সমর্থন জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই পোস্টার প্রচারণা এবং দেয়াল লিখনের বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারকে ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামিতা নিষিদ্ধ এবং এর জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। এই আইনটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এর বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের পোস্টার প্রচারণা এবং দেয়াল লিখন দেশে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা, ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি বৈরিতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার অবনতির প্রতিফলন। এটি দেশে সংখ্যালঘু এবং ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষদের জন্য ক্রমবর্ধমান অনিরাপত্তার ইঙ্গিত দেয়।

























