আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে
বাংলাদেশসহ বিশ্বের ছয়টি দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঘোষণা
দিয়েছে ইরান। গত বুধবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে
এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। তেহরানের পক্ষ
থেকে জানানো হয়েছে, এই দেশগুলোর কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান কখনও হামলা করবে না এবং
যুদ্ধ চলাকালীন বা যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও তারা এই জলপথে বিশেষ ‘নিরাপত্তা প্যাসেজ’
সুবিধা পাবে। বাংলাদেশের পাশাপাশি এই তালিকার বাকি পাঁচটি দেশ হলো— ভারত, চীন,
রাশিয়া, পাকিস্তান এবং ইরাক।
সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান বর্তমানে হরমুজ
প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি, বরং সেখানে বিদেশি জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে
নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি জানান, বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র তাদের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ
চলাচলের জন্য ইতিমধ্যে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং অনুরোধ জানিয়েছে। এই
রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যাদের ইরান ‘মিত্র’ বলে বিবেচনা করে, তাদের বিষয়ে ইতিবাচক
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)
আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, উল্লিখিত ছয়টি দেশের জাহাজে কোনো সামরিক
পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এবং
তাদের সমন্বিত সম্মতির মাধ্যমেই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
জ্বালানি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের মোট
অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। গত ২৮
ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই
প্রণালিতে কঠোর অবরোধ জারি করে তেহরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত
হচ্ছে এবং তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। ইরান অবশ্য শুরু থেকেই দাবি করে আসছে
যে, তাদের এই অবরোধ কেবল ‘শত্রুভাবাপন্ন’ রাষ্ট্র যেমন— যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং
তাদের মিত্রদের ওপর প্রযোজ্য। বিপরীতপক্ষে, ‘অশত্রু’ বা ‘মিত্র’ রাষ্ট্রগুলোর জাহাজ
চলাচলে ইরান সবসময়ই নমনীয় থাকবে।
তবে মিত্রদেশগুলোর জাহাজে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও কিছু কঠোর নিয়ম জারি
করেছে ইরান। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এসব দেশের জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের
আগে অবশ্যই ইরানের সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি
গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি, জলপথটি ব্যবহারের জন্য টোল আদায়ের বিষয়েও ভাবছে
তেহরান। ইরানি সংবাদমাধ্যম ফার্স-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে
চলাচলে ইচ্ছুক সব বিদেশি জাহাজকে বাধ্যতামূলকভাবে টোল দিতে হবে— এমন একটি আইন
প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। ইতিমধ্যে সেই আইনের খসড়া তৈরির
প্রক্রিয়াও চলছে।
পরিশেষে বলা যায়, ইরানের এই ঘোষণা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য স্বস্তির
খবর নিয়ে এসেছে, যারা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
বৈশ্বিক এই অস্থিরতার মাঝেও এই ছয়টি দেশের জাহাজের জন্য ইরানের বিশেষ ছাড়
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে তেহরানের নতুন মিত্রতার সমীকরণকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
এটি কেবল সামুদ্রিক নিরাপত্তা নয়, বরং বাণিজ্যিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও
এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।























