বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের ওপর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক চাপ
তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। তাদের মতে, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০
ডলার বাড়লে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বাড়বে। আর দীর্ঘ সময় ধরে দাম
১২০ ডলারের বেশি থাকলে অতিরিক্ত ব্যয় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা দেশীয়
মুদ্রায় প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকার সমান।
শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা
হয়। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ বিসিক শিল্পনগরীর এসএমই শিল্পগুলোর জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন
নিঃসরণ ও ডিকার্বনাইজেশন সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ আয়োজন
করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ
জ্বালানির জন্য আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার
বাড়লে মাসিক ব্যয় প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পায়, যা বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে
দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একদিকে সংকট, অন্যদিকে সুযোগ। এখনই
যদি জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে এই সুযোগ
হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার দীর্ঘদিন ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি
সামাল দিতে পারবে না। একপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় করতে বাধ্য হলে শিল্পখাতে
‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”
গবেষণায় বলা হয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে ক্ষুদ্র ও মাঝারি
শিল্প খাতে। দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এই খাতনির্ভর হওয়ায় এর
ক্ষতি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বড় শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি
পোশাক খাতও অনেকাংশে এসএমইর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ঝুঁকি বাড়বে।
গবেষকরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর
হওয়া জরুরি। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে বিসিক শিল্পনগরীগুলো থেকে বছরে ১৪ দশমিক
শূন্য ৯ মিলিয়ন টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কার্বন ক্রেডিট
ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে প্রায় শূন্য দশমিক ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের সুযোগ তৈরি
হতে পারে।
এছাড়া চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে এসএমই খাতে বিকেন্দ্রীভূত রুফটপ
সোলার প্যানেলের ব্যবহার বাড়ানো গেলে পরিচালন ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো
সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, দেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশের বেশি এসএমই খাতের
অন্তর্ভুক্ত, যা শিল্পখাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তিকে নিয়োজিত করে এবং জিডিপিতে
২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রাখে। তবে এই খাত এখনো প্রায় ৯৫ শতাংশ জীবাশ্ম
জ্বালানিনির্ভর, যা বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশের এনডিসি ৩.০ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে জ্বালানি খাত থেকে ৬৯
দশমিক ৮৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ
লক্ষ্য অর্জনে শিল্পখাতে জ্বালানি রূপান্তর জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়।
গবেষণায় বিসিক শিল্পনগরীর চামড়া, প্লাস্টিক উৎপাদন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং হালকা
প্রকৌশল খাতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব খাত মিলিয়ে বছরে প্রায় ৪৬ দশমিক
৯৯ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ হয়, যার মধ্যে প্রযুক্তিগতভাবে প্রায় ১৪ দশমিক ০৯৭
মিলিয়ন টন কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চামড়া শিল্পে ১৯ থেকে ৩৩ শতাংশ, হালকা প্রকৌশলে ১৯
থেকে ৩১ শতাংশ, প্লাস্টিক শিল্পে ৩৩ থেকে ৪৯ শতাংশ এবং প্যাকেজিং খাতে ১৫ থেকে ২৮
শতাংশ পর্যন্ত নিঃসরণ কমানো সম্ভব।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, বিসিক শিল্পনগরীর মাত্র ১০ শতাংশ খালি জায়গা ব্যবহার
করে প্রায় ৫৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এর মাধ্যমে বছরে ৮২ হাজার ৯৬৮
মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রায় ৫১ হাজার ৪৪০ দশমিক ৭১ টন কার্বন নিঃসরণ
হ্রাস করা যাবে।
এই খালি জায়গার ব্যবহার ২০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে উৎপাদন সক্ষমতা ১১৪ মেগাওয়াটে
পৌঁছাতে পারে। তখন বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯৩৭ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন
সম্ভব হবে, যা প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৮৮১ দশমিক ৪১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ
কমাতে সহায়ক হবে।

























