ভারতে বৈবাহিক ধর্ষণ বা ‘ম্যারিটাল রেপ’ এখনো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত না হলেও
বিষয়টি নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্ক ও সামাজিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে সম্প্রতি মুক্তি
পাওয়া ওয়েব সিরিজ ‘চিরাইয়া’। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জিও হটস্টারে গত মার্চে মুক্তির পর
থেকেই এই হিন্দি সিরিজটি লাখ লাখ দর্শকের কাছে পৌঁছেছে এবং ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় এই শোটি কেবল নিছক বিনোদন নয়, বরং দেশটির গভীর
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার এক অন্ধকার ও অমানবিক দিককে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে
জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।
হিন্দি শব্দ ‘চিরাইয়া’র অর্থ ‘ছোট পাখি’। এই নাম থেকেই বোঝা যায় সিরিজটি মূলত
শৃঙ্খলিত স্বপ্নের মুক্তির কথা বলে। এর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে দুই কেন্দ্রীয় চরিত্র
কমলেশ ও পূজাকে কেন্দ্র করে। পূজা একজন উচ্চশিক্ষিত, সচেতন ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন
আধুনিক নারী, যে জেন্ডার সমতায় বিশ্বাসী। কিন্তু তার সব স্বপ্ন ও বিশ্বাস তছনছ হয়ে
যায় যখন বিয়ের প্রথম রাতেই সে তার স্বামী অরুণের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়।
যখন পূজা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, তখন তার স্বামীর উত্তর ছিল আরও রূঢ়। সে অত্যন্ত
স্বাভাবিকভাবে দাবি করে যে সে কেবল ‘নিজের অধিকারে থাকা সম্পদ’ ভোগ করেছে। অরুণের
এই সংলাপ ভারতের সেই রূঢ় বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে যেখানে বিয়ের বন্ধনকে নারীর ওপর
পুরুষের একচ্ছত্র মালিকানা হিসেবে দেখা হয়।
সিরিজে আরও একটি বেদনার দিক ফুটে ওঠে পরিবারের অসহযোগিতার মাধ্যমে। যখন নির্যাতিত
পূজা পরিবারের কাছে সাহায্য চায়, তখন তার মা থেকে শুরু করে শাশুড়ি—সবাই তাকে
‘মানিয়ে নেওয়ার’ এবং ‘সংসারের শান্তির স্বার্থে চুপ থাকার’ পরামর্শ দেয়। তবে
চরিত্রের বিবর্তন ঘটে কমলেশের মধ্যে, যে নিজেও সারাজীবন পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলে
আবদ্ধ থেকে ঘরকন্নাকে নারীর একমাত্র কাজ বলে মেনে নিয়েছিল। গল্পের একপর্যায়ে সে
নিজের নৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে পূজার লড়াইয়ের প্রধান সহযোদ্ধা ও নির্ভরযোগ্য
বন্ধু হয়ে ওঠে। এই রূপান্তরটি দর্শকদের বিশেষভাবে আলোড়িত করেছে।
ভারতের জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৬ দশমিক ১
শতাংশ বিবাহিত নারী নিজ স্বামীর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের যৌন সহিংসতার শিকার হন।
তাসত্ত্বেও পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং সৌদি আরবের মতো ভারতও বিশ্বের সেই কয়েক ডজন
দেশের একটি যেখানে বৈবাহিক ধর্ষণকে এখনো আইনি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। এর
পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির একটি পুরোনো ধারা, যেখানে স্ত্রী
নাবালিকা না হলে স্বামী কর্তৃক জোরপূর্বক যৌন মিলনকে ধর্ষণ হিসেবে স্বীকার করা
হয়নি। ভারত সরকার এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের মতে, এটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করলে
‘বিয়ের পবিত্রতা’ নষ্ট হবে এবং পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। অন্যদিকে, পুরুষ
অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা যে এমন আইন হলে বিচ্ছেদের সময় নারীরা এর অপব্যবহার করতে
পারে।
সিরিজটির পরিচালক শশান্ত শাহ এবং চিত্রনাট্যকার দিব্য নিধি শর্মা জানিয়েছেন, এটি
মূলত জনপ্রিয় বাংলা ওয়েব সিরিজ ‘সম্পূর্ণা’র হিন্দি সংস্করণ। উত্তর ভারতের চরম
পুরুষতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল পরিবেশকে তুলে ধরতেই এই সংস্করণটি নির্মাণ করা হয়েছে।
তাঁদের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা আইনকে সরাসরি আক্রমণ করা নয়, বরং সমাজের
গভীরে প্রোথিত নারীবিদ্বেষী মানসিকতাকে একটি আয়না দেখানো। প্রখ্যাত অভিনেত্রী
দিব্যা দত্তার মতে, বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে কথা বলা ভারতীয় সমাজে এখনো একটি বড়
‘ট্যাবু’। অনেক নারীই মনে করেন এটি কেবল তার একার যন্ত্রণা এবং মুখ খুললে তাকেই
সামাজিকভাবে কলঙ্কিত হতে হবে। ‘চিরাইয়া’ সেই দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা ভাঙার একটি
শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করছে।
সিরিজটি মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সম্মতি’ (Consent) এবং নারীবিদ্বেষ
নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। চলচ্চিত্র সমালোচকেরা বিষয়টিকে অত্যন্ত
সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপনের জন্য প্রশংসা করলেও, রক্ষণশীল ও ট্রলকারীদের পক্ষ থেকে
এটিকে ‘পুরুষবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে বয়কটের ডাকও দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভারতের
সুপ্রিম কোর্টে বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার জন্য একাধিক আবেদন ঝুলে
আছে। ‘চিরাইয়া’র মতো প্রভাবশালী সৃজনশীল কাজগুলো হয়তো রাতারাতি আইন বদলাবে না, তবে
মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে এটি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে
মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
























