রাজধানীর শাহবাগে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি ও সমকামীদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনাটি শুধু সহিংসতার জন্যই নয়, বরং পুলিশ প্রশাসনের দৃশ্যমান নিষ্ক্রিয়তার কারণে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে প্রায় আধাঘণ্টা ধরে হামলা চললেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা কার্যত কোনো হস্তক্ষেপ করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন হামলা নয়, এটি নগর নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সন্ধ্যা সাড়ে ৮টার দিকে ‘আজাদী আন্দোলন’ ব্যানারে খেলাফত ছাত্র মজলিসের ৭০–৮০ জন কর্মী শাহবাগে জড়ো হয়ে সমকামিতাবিরোধী স্লোগান দিতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থানরত ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামী ব্যক্তিদের দিকে এগিয়ে যান এবং ১০ মিনিটের আল্টিমেটাম দিয়ে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেন।
উত্তেজনা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়। উত্তেজনা বাড়তে থাকলে সমাবেশকারীরা অতর্কিতে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি ও সমকামীদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারীরা স্লোগান দিতে দিতে ভুক্তভোগীদের ওপর চড়াও হন, মারধর করেন এবং ধাওয়া করে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পুরো ঘটনাটি শাহবাগ থানার সামনেই ঘটেছে, যেখানে পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তারা কোনো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেননি।
হামলার শিকার এক ব্যক্তি জানান, তারা চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সমাবেশকারীরা এগিয়ে এসে তাদের “সমকামী” আখ্যা দিয়ে হুমকি দিতে থাকেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মারধর শুরু করেন।
তার অভিযোগ, “আমরা পুলিশের কাছে দৌড়ে গিয়ে সাহায্য চাইলে তারা নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমাদের চোখের সামনে হামলা চলছিল, কিন্তু পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।”
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সবাই শারীরিক আঘাতের শিকার হন। কেউ মাটিতে ফেলে লাথি খেয়েছেন, কারও কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, আবার কারও চশমা ভেঙে গেছে। পথচারী ও দোকানদাররা এগিয়ে এসে সাহায্য করলেও পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল।
হামলার পর ভুক্তভোগীরা শাহবাগ থানায় আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও তারা হয়রানির মুখে পড়েন বলে অভিযোগ। থানায় উপস্থিত কিছু মোবাইল সাংবাদিক বারবার ভিডিও করতে থাকলেও পুলিশ তাদের থামায়নি।
ভুক্তভোগীরা জানান, মামলা করতে চাইলে পুলিশ প্রথমে অস্বীকৃতি জানায় এবং জিডি নিতেও অনীহা দেখায়। দীর্ঘ সময় অনুরোধ করার পরও পুলিশের মন গলেনি। পরবর্তীতে কিছু গণ্যমান্য মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের অনুরোধে পুলিশ দীর্ঘ সময় পর একটি এফআইআর নিতে রাজি হলেও পরবর্তীতে জানা যায় এটি মূলত এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়নি, শুধুমাত্র একটি অভিযোগপত্র হিসাবে জমা করা হয়েছে।
এই আচরণ আইনগত প্রক্রিয়া ও ভুক্তভোগীদের অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
হামলার পর রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ‘আজাদী আন্দোলন’ ব্যানারে শাহবাগ এলাকাজুড়ে মিছিল করেন খেলাফত ছাত্র মজলিসের নেতাকর্মী ও তাদের সঙ্গে যুক্ত কয়েকশ জনতা। মিছিলে সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান শোনা গেলেও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি।
শহরের অন্যতম একটি ব্যস্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে আরও প্রশ্ন তোলে।
হামলার শিকার ব্যক্তিরা বলেন, “এটি শুধু হামলা নয়; এটি আমাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। পুলিশ যদি শুরুতেই হস্তক্ষেপ করত, পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না।”
তারা ঘটনার পূর্ণ তদন্ত, হামলাকারীদের গ্রেপ্তার এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণ অনুসন্ধানের দাবি জানান।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা শুধু আইনগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
























