যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার জন্য পাকিস্তানে ব্যাপক প্রস্তুতি
চলছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অগ্রাহ্য করার অভিযোগে ইরানের একটি কার্গো
জাহাজ মাঝসমুদ্রে আটক করেছে মার্কিন বাহিনী। এতে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের
দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা নিয়ে শঙ্কা তৈরী হয়েছে।
ইরানি জাহাজ আটকের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আমিন সাইক্যাল। আল জাজিরাকে দেওয়া
একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ সহজেই উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
একই সঙ্গে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ইতিবাচক ফলাফলের সম্ভাবনাও
নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি উভয় পক্ষ সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছাতে চায়, তাহলে এখনই
এমন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা উচিত যা সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে।’ডোনাল্ড
ট্রাম্পের অবস্থান প্রসঙ্গে সাইক্যাল বলেন, ‘একদিকে তিনি সংকটের সমাধান চান বলে
দাবি করছেন, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছেন। এই দ্বৈত অবস্থান পরিস্থিতিকে
আরও জটিল করে তুলছে।’
যুদ্ধবিরতির সময়সীমা ঘনিয়ে আসার মধ্যে উভয় পক্ষই ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে বলেও
মন্তব্য করেন তিনি। তবে তার ভাষ্য, হরমুজ প্রণালি এখন ইরানের জন্য নতুন এক
প্রতিরোধক শক্তি হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক গবেষক
মোহাম্মদ এসলামি মনে করেন, ‘ইরান প্রণালিটি বন্ধ করেছে সেটি আবার খোলার জন্যই। এটি
মূলত একটি দর-কষাকষির কৌশল।’
’যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর কোনো আলোচনার পরিকল্পনা নেই’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর কোনো আলোচনার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে ইরানের
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল সোমবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের
মুখপাত্র ঈসমাইল বাঘেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানান।
বাঘেই অভিযোগ করেন, গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি প্রথম
থেকেই ভঙ্গ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন প্রথম থেকেই চুক্তির
শর্ত অমান্য করে নৌ-অবরোধ বহাল রেখেছে এবং অতীতে আলোচনার চলাকালীন সময়েও হামলা
চালিয়েছে, যা তেহরান ভুলে যায়নি। এই বিষয়টি ইতিমধ্যে মধ্যস্থতাকারী দেশ
পাকিস্তানকেও অবহিত করেছে ইরান।
ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মার্কিনিদের সঙ্গে
পুনরায় আলোচনায় বসার কোনো পরিকল্পনা তাঁদের নেই, তবে তেহরান সর্বদা তাদের জাতীয়
স্বার্থ রক্ষা করে যাবে। বাঘেই কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি ইসরায়েল ও
যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো যুদ্ধের উসকানি দেয় বা সংঘাত শুরু করতে চায়, তবে ইরানের
সশস্ত্র বাহিনী তার কঠোর জবাব দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত
প্রথম দফার বৈঠকে ইরান তাদের ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের
অসহযোগিতার কারণে অগ্রগতি সম্ভব হয়নি।
বৈঠকে লেবানন প্রসঙ্গ তুলে ধরে এই ইরানি কূটনীতিক বলেন, একটি সমঝোতা হয়েছিল যে
লেবাননও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আওতায় থাকবে। কিন্তু পাকিস্তান
আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে ঘোষণা দেওয়ার পরও ওয়াশিংটন তা অস্বীকার করে।
বাঘেই দাবি করেন, যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল এবং বর্তমান
পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের আগ্রাসী মনোভাবই দায়ী। তিনি অভিযোগ
করেন, আলোচনার টেবিলে বসেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ
প্রত্যাহার না করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও মধ্যস্থতাকারী
দেশ পাকিস্তান এখনো আশাবাদী। দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য
ব্যাপক প্রস্তুতি ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ইরানের এই কঠোর
অবস্থানের পর আসন্ন বৈঠকটি আলোর মুখ দেখবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ইরানের পক্ষ থেকে সাফ
জানানো হয়েছে যে তারা আর কোনো ‘অফলপ্রসূ’সংলাপে অংশ নেবে না।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানে মোট নিহত ৩ হাজার ৩৭৫
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বাহিনীর হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৭৫ জনে
পৌঁছেছে। গতকাল সোমবার ইরানের লিগাল মেডিসিন অর্গানাইজেশন এ তথ্য জানিয়েছে বলে
সংবাদ প্রকাশ করেছে দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি।
ইরানের লিগাল মেডিসিন অর্গানাইজেশন সংস্থাটির প্রধান আব্বাস মাসজেদি জানান, গত ২৮
ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাত থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিহতদের
মধ্যে ২ হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী রয়েছেন। তিনি বলেন, এখনো চারটি মরদেহ
শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
মাসজেদি জানান, ব্যবহৃত বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্রতার কারণে প্রায় ৪০ শতাংশ মরদেহ
প্রথমদিকে শনাক্ত করা যায়নি। পরে তেহরান, ইসফাহান ও হরমোজগানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের
বিশেষজ্ঞরা এসব মরদেহ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন।
তিনি আরও বলেন, নিহতদের বড় অংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ-শিশু, বয়স্ক এবং বিভিন্ন
প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের শারজাহ
তায়্যিবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলাকে হৃদয়বিদারক উল্লেখ করে তিনি জানান, ওই ঘটনায়
১৬৮ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক
অভিযান শুরু করে। এতে দেশজুড়ে সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালানো হয়,
যার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। এর জবাবে ইরানের সশস্ত্র
বাহিনী বিভিন্ন দফায় মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও রাডার লক্ষ্য করে
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে পাল্টা আঘাত হানে।






















