ইরানের চারটি তেলের ডিপো এবং একটি পেট্রোলিয়াম পরিবহন কেন্দ্রে ভয়াবহ হামলা
চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান বাহিনী। শনিবার (৭ মার্চ) রাতের এই হামলায়
অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোর গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে
জানা গেছে।
ইরানের জাতীয় তেল উত্তোলন ও বিতরণ কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী কেরামাত বিয়েসকারামি
দেশটির সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই হামলার তথ্য নিশ্চিত
করেছেন।
তিনি জানান, তেহরান এবং আলবোর্জ প্রদেশে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর বোমা
হামলায় চারটি তেলের ডিপো এবং একটি পেট্রোলিয়াম পরিবহন কেন্দ্র মারাত্মকভাবে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুজন তেলের ট্যাংকার ট্রাকের চালক ছিলেন বলে তিনি
উল্লেখ করেন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) পৃথক এক বিবৃতিতে এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত
করেছে। তারা জানিয়েছে, ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও সক্ষমতা কমিয়ে আনতেই এই অভিযান
চালানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে,
হামলার পর তেলের ডিপোগুলোতে বিশাল অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে এবং আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী
দেখা যাচ্ছে। এই হামলার ফলে ইরানের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ার
আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সংযুক্ত
আরব আমিরাতের পতাকাবাহী একটি টাগবোট ডুবে গেছে। এ ঘটনায় তিনজন ইন্দোনেশীয় নাবিক
নিখোঁজ রয়েছেন।
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মুসাফাহ-২ নামের টাগবোটটি শুক্রবার
(৬ মার্চ) ডুবে যায়। এতে মোট সাতজন নাবিক ছিলেন, যাদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও
ফিলিপাইনের নাগরিকরা ছিলেন। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, সাতজনের মধ্যে চারজনকে
উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে তিনজন ইন্দোনেশীয় নাবিক এখনো নিখোঁজ।
ডুবে যাওয়ার আগে জাহাজটিতে একটি বিস্ফোরণ ঘটে এবং পরে এতে আগুন ধরে যায় বলে
জানানো হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে।
নিরাপত্তা সংস্থা ভ্যানগার্ড টেক জানিয়েছে, মাল্টার পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ
সাফিন প্রেসটিজকে সহায়তা করতে যাওয়ার সময় টাগবোটটি দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই কনটেইনার জাহাজটিও বুধবার একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার
হয়েছিল বলে সংস্থাটি জানায়।
কুয়েত বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা
কুয়েত বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংকে রোববার (৮ মার্চ) সকালে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে
আনার কথা জানিয়েছে কুয়েতি কর্তৃপক্ষ। এদিন সকালে কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
দুই সীমান্ত নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়ার কয়েক মিনিট পর আগুন
নিয়ন্ত্রণের খবর এলো। দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বিমানবন্দরের জ্বালানি
ট্যাংকগুলো ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
সামরিক বাহিনীর এক্স পোস্টে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, কুয়েত
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংকগুলো ড্রোনের হামলার মুখে পড়েছে, যা
গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর সরাসরি হামলা। মুখপাত্র বলেন, সশস্ত্র বাহিনী দেশের
আকাশসীমা লঙ্ঘন করা ‘শত্রুভাবাপন্ন ড্রোনের ঢেউ’ মোকাবিলা করছে।
ইসরায়েল ও জর্ডানে হামলার দাবি ইরানের
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইসরায়েলের তেল আবিব ও
বিয়ারশেবা শহরের ‘সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে’ তারা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করে, জর্ডানের আজরাক শহরে অবস্থিত ‘আমেরিকান আগ্রাসী
যুদ্ধবিমানগুলোর সবচেয়ে বড় ও সক্রিয় আক্রমণাত্মক ঘাঁটি’ মুওয়াফফাক আল-সালতি
বিমানঘাঁটিতে একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে।
কঠোর হামলার হুমকিতেও অনড় তেহরান
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। দেশটির ওপর আরও
কঠোর ও বিস্তৃত পরিসরে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড
ট্রাম্প। তিনি ইরানের আরও নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করা ও দেশটির বিভিন্ন স্থাপনা
পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে ইরান কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ করবে না বলে আবারও জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট
মাসুদ পেজেশকিয়ান। গতকালও ইসরায়েলে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে
মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে হামলার ঘটনায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি
এও বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশ থেকে ইরান আক্রান্ত না হলে পাল্টা হামলা চালাবে
না তেহরান।
যুদ্ধের অষ্টম দিনে ইরানে হামলা আরও তীব্র করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তেহরানের
মেহরাবাদ বিমানবন্দর ও ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সামরিক
বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে দিনের শুরুতেই ব্যাপক হামলা চালানোর
কথা জানায় ইসরায়েলি বাহিনী।
মার্কিন–ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরানের সামরিক বাহিনীও ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের
বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন
ছুড়েছে। এসব হামলায় হাইপারসনিক (শব্দের গতির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতিসম্পন্ন)
ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি, সংযুক্ত
আরব আমিরাতের আল-দাফরা বিমানঘাঁটি ও কুয়েতের আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে
হামলা হয়েছে। ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে দুবাই বিমানবন্দরে।
ইরানের হামলায় মানামায় একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে মাল্টা ও মার্শাল আইল্যান্ডের
পতাকাবাহী দুটি তেলের জাহাজে আঘাত হানার দাবি করেছে আইআরজিসি।
চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান ছাড়া এসব দেশে ২৯ জন নিহত
হয়েছেন। এর মধ্যে রোববার (৮ মার্চ) সংযুক্ত আমিরাতের দুবাইয়ে আল–বারশা এলাকায়
ভূপাতিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন গাড়িচালক নিহত হন। ইরানে
নিহতের সংখ্যার হালনাগাদ তথ্য রোববার (৮ মার্চ) জানানো হয়নি। শুক্রবারের তথ্য
অনুযায়ী, দেশটিতে ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন।
কঠোর আঘাত হানার হুমকি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে বিবৃতিতে ইরানকে ‘খুবই কঠোরভাবে আঘাত’ হানার
হুমকি দেন। তিনি বলেন, ইরানের নেতিবাচক আচরণের কারণে কিছু স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস ও
নেতৃস্থানীয়ও আরও কিছু ব্যক্তিকে হত্যা করা হতে পারে। এসব স্থাপনা ও ব্যক্তিকে আগে
নিশানা করার সিদ্ধান্ত ছিল না। এ সময় ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তার
প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়েছে ও ‘নতি স্বীকার’ করেছে। পাশাপাশি দেশটি তাদের
ওপর আর হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

























