আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য নৌপথ হরমুজ প্রণালি থেকে পেতে রাখা মাইনগুলো
অপসারণ করতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে বলে ধারণা করছে মার্কিন
নৌবাহিনী। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই রুটটি পুনরায় সচল করার ক্ষেত্রে এই
মাইনগুলো এখন সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে,
পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে এই পথে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ
হবে।
মার্কিন নৌবাহিনী এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই দীর্ঘ সময় লাগার পেছনে প্রধানত দুটি
কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, স্থলভাগের তুলনায় সমুদ্রের তলদেশে মাইন শনাক্ত করা
এবং সেগুলো নিষ্ক্রিয় করা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। তার ওপর, ইরানের ইসলামি
বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) প্রণালির ঠিক কোন কোন অবস্থানে মাইন পেতেছে, তার
কোনো নির্ভুল রেকর্ড বা মানচিত্র মার্কিন বাহিনীর কাছে নেই। ফলে প্রথমে প্রতিটি
মাইনের অবস্থান নিখুঁতভাবে খুঁজে বের করতে হচ্ছে এবং এরপর সেগুলো ধ্বংস করার
প্রক্রিয়া শুরু করতে হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ইরান এই এলাকায় অত্যন্ত কৌশলী এবং বৈচিত্র্যময় মাইনের ব্যবহার করেছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে বটম মাইন, টেদার্ড মাইন, ড্রিফটিং
মাইন এবং লিম্পেট মাইনের মতো কয়েক ধরণের মাইন স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু মাইন
সমুদ্রতলে পড়ে থাকে যা ওপর দিয়ে জাহাজ যাওয়ার সময় বিস্ফোরিত হয়, আবার কিছু মাইন
পানির উপরিভাগে ভেসে থাকে। মাইনের এই ভিন্ন ভিন্ন ধরণ ও কার্যকারিতার কারণেই
মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দলকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগোতে হচ্ছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর অপারেশন্স বিভাগের প্রধান অ্যাডমিরাল ডেরিল কাউডলে এ প্রসঙ্গে
জানিয়েছেন যে, সমুদ্র থেকে মাইন অপসারণ কার্যক্রম সবসময়ই একটি দীর্ঘমেয়াদী
প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ব্রায়ান ক্লার্ক সতর্ক
করে বলেছেন যে, পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রণালিটি পুরোপুরি নিরাপদ করতে কমপক্ষে ২১ দিন
বা তার বেশি সময় লেগে যেতে পারে।
উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পর কৌশলগত
এই জলপথে মাইন স্থাপন করেছিল আইআরজিসি। ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালিটি বিশ্ব
অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২৫
শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। দীর্ঘ উত্তেজনার পর গত ৮ এপ্রিল সাময়িক যুদ্ধবিরতি
ঘোষিত হলেও মাইন আতঙ্কে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি।
গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনা কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হওয়ার পর মার্কিন
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর পুনরায় অবরোধের ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণার
পরপরই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকোম) এক বিবৃতিতে জানায় যে, তারা হরমুজ
প্রণালি নিরাপদ করতে বিশেষায়িত ড্রোন ও জাহাজ ব্যবহার করে মাইন অপসারণের কাজ শুরু
করেছে। তবে বিশ্ববাজারের জ্বালানি স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই তিন সপ্তাহের দীর্ঘ
অপেক্ষা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন কোনো অস্থিরতা তৈরি করে কি না, সেটিই এখন দেখার
বিষয়।

























