মিয়ানমারে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দেশজুড়ে
এক বিশাল সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জান্তা প্রধান থেকে নবনিযুক্ত
প্রেসিডেন্ট হওয়া সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) ৪ হাজার ৩৩৫
জন কারাবন্দির সাজা মওকুফ ও কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের মধ্যে সবচেয়ে
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো দেশটির কারাবন্দি গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সু চির সাজা
প্রায় সাড়ে চার বছর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এমআরটিভি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের এই বিশেষ ক্ষমার আওতায় ২০২১ সালের সামরিক
অভ্যুত্থানের পর থেকে কারান্তরীণ থাকা সাবেক প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টকে শর্তসাপেক্ষে
পূর্ণ সাধারণ ক্ষমা প্রদান করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে,
নির্দিষ্ট কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা ও শর্ত মেনে চলার অঙ্গীকার সাপেক্ষে তাঁর অবশিষ্ট
সাজা মওকুফ করা হয়েছে। তবে সু চির ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। ৮০ বছর বয়সী এই
নোবেলজয়ী নেত্রী বর্তমানে ২৭ বছরের দীর্ঘ সাজা ভোগ করছেন। প্রেসিডেন্টের বিশেষ
আদেশে তাঁর সাজা থেকে সাড়ে চার বছর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সাজা কমলেও তাঁকে
কারাগার থেকে সরিয়ে পুনরায় গৃহবন্দিত্বে রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে সু চির আইনজীবী
বা সরকারি পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এমআরটিভি-র প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মানবিক দিক বিবেচনা করে এবং দেশের চলমান
পরিস্থিতিতে জাতীয় সংহতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুক্তি পাওয়া ৪
হাজার ৩৩৫ জন বন্দির মধ্যে ১৭৯ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। মানবিক সৌজন্য হিসেবে এই
বিদেশি বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার পর দ্রুততম সময়ে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর
প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে এই সাধারণ ক্ষমার
আওতায় সকল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়েছে।
এছাড়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মেয়াদের সর্বোচ্চ সীমা কমিয়ে ৪০ বছর করা এবং
অন্যান্য সাধারণ বন্দিদের ক্ষেত্রে সাজার একটি নির্দিষ্ট অংশ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত
নেওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারে প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে স্বাধীনতা দিবস এবং এপ্রিল মাসে
ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উপলক্ষে বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার একটি রীতি প্রচলিত আছে। তবে
এবারের সাধারণ ক্ষমাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি মিন অং হ্লাইংয়ের প্রেসিডেন্ট
হিসেবে দেওয়া প্রথম বড় ধরণের সরকারি আদেশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক
চাপ মোকাবিলা এবং দেশের অভ্যন্তরে চলমান গৃহযুদ্ধের মাঝে নিজেদের ভাবমূর্তি কিছুটা
নমনীয় করতেই জান্তা সরকার সু চি ও উইন মিন্টের বিষয়ে এমন কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ২০২১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে
ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এরপর থেকেই অং সান সু চি ও এনএলডি-র শীর্ষ
নেতাদের বিভিন্ন অভিযোগে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর পর সু চির সাজা
কমানোর এই ঘোষণাকে তাঁর অগনিত ভক্ত ও সমর্থকরা ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, তাঁর পূর্ণ
মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক মহলে গুঞ্জন এখনো অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান এই সাধারণ
ক্ষমার ফলে মিয়ানমারের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো স্থায়ী স্থিতিশীলতা আসে কি
না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।























