মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে
বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর তৈরি হওয়া বাড়তি চাপ সামাল দিতে
বিশ্বের ৩৯টি দেশ তাদের জ্বালানি কর কমানোর পথে হাঁটছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী,
গত মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দেশের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ
হয়েছে। মূলত নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং মূল্যস্ফীতির
লাগাম টেনে ধরতেই সরকারগুলো তাদের রাজস্বের একটি অংশ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কর কমানোর এই নতুন প্রবণতায় ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ইউরোপের দেশগুলো। ৩৯টি
দেশের মধ্যে ১৯টিই ইউরোপ মহাদেশের, যারা জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত শুল্ক বা ভ্যাট
কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের দেশগুলো
সম্মিলিতভাবে জ্বালানি খাতে প্রায় ৯৫০ কোটি ইউরো ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর
মধ্যে স্পেন একাই ৩৫০ কোটি ইউরো এবং জার্মানি ১৬০ কোটি ইউরো ব্যয় করছে। এ ছাড়া
ইতালি সাময়িকভাবে ২০ শতাংশ কর কমিয়ে প্রায় ১০০ কোটি ইউরো খরচ করার পরিকল্পনা হাতে
নিয়েছে।
জ্বালানি তেলের এই আকাশচুম্বী দামের মূলে রয়েছে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের
মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক
সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। যেহেতু বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি
বাণিজ্য এই নৌপথ দিয়েই পরিচালিত হয়, তাই সেখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক
বাজারে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না
হওয়া পর্যন্ত এই সংকট কাটবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ ধরনের ঢালাও কর কমানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে
বারবার সতর্কবার্তা প্রদান করছে। সংস্থাটির মতে, অনেক দেশের সরকারি ঋণের বোঝা আগে
থেকেই বেশি, তাই নতুন করে রাজস্ব আয় কমিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় করলে জাতীয় অর্থনীতি গভীর
ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আইএমএফ মনে করে, করছাড়ের এই সহায়তা হওয়া উচিত ছিল সুনির্দিষ্ট
লক্ষ্যভিত্তিক এবং সাময়িক। অন্যথায় এটি কেবল সরকারি কোষাগারে চাপ সৃষ্টি করবে না,
বরং দরিদ্র মানুষের কাছে প্রকৃত সুফল পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অনেক দেশ একসাথে কর কমালে
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির চাহিদা কৃত্রিমভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত
তেলের দামকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। অনেক দেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে
দামের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ বা বিক্রেতাদের মুনাফায় নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করছে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কমিশন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে
নবায়নযোগ্য শক্তি এবং বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদী
পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব
হয়।

























