যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানে গুরুতর আহত ইরানের নতুন
সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ
করেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও ঘনিষ্ঠ তিনটি সূত্রের
বরাত দিয়ে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, ভয়াবহ সেই হামলায় ৫৬ বছর বয়সী
এই নেতার চেহারা উল্লেখযোগ্যভাবে বিকৃত হয়ে গেছে। এছাড়া তাঁর পায়ের আঘাতও অত্যন্ত
উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। তবে হামলায় তাঁর একটি পা না-কি দুই পা-ই ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছে, সে সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
শারীরিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মোজতবা খামেনি বর্তমানে আঘাত কাটিয়ে ওঠার
প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,
তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সজাগ ও সচেতন আছেন। এমনকি মস্কোর হাসপাতালের বিছানায়
শায়িত থেকেও তিনি নিয়মিতভাবে ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অডিও বার্তার
মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে
সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। বিশেষ করে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধিদের
সঙ্গে ইরানের আসন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কৌশল
নির্ধারণে তাঁর সরাসরি ভূমিকা রয়েছে বলে রয়টার্স নিশ্চিত করেছে।
তবে মোজতবা খামেনির এই শারীরিক অবস্থা এবং শাসন ক্ষমতা পরিচালনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এক
ধরণের রহস্য বজায় রয়েছে। গত ৮ মার্চ তাঁর পিতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর
তিনি উত্তরসূরি হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হলেও এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো ছবি, ভিডিও কিংবা
অডিও রেকর্ডিং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এই দীর্ঘ নিরবতা তাঁর সুস্থতা এবং
প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে
বিস্তারিত জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে
যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘ
দুই দশকের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সংক্রান্ত বিরোধ। গত ৬ ফেব্রুয়ারি
থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ২১ দিন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নিবিড় সংলাপ
চললেও শেষ পর্যন্ত তা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। এর পরপরই ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে
মার্কিন বাহিনী ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইসরায়েল ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে
ইরানে সর্বাত্মক হামলা শুরু করে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই এক বিধ্বংসী হামলায় ইরানের
টানা ৩৭ বছরের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। একই হামলায় খামেনির
স্ত্রী, কন্যা, নাতি এবং মোজতবা খামেনির স্ত্রীও প্রাণ হারান, যা ইরানি নেতৃত্বের
জন্য এক বিশাল ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমানে মোজতবা খামেনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে
এবং বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মস্কোর একটি সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ১২
মার্চ একটি রুশ সামরিক বিমানে করে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য মস্কো নিয়ে যাওয়া হয়।
ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং চলমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এখন অনেকাংশেই মোজতবার
শারীরিক অবস্থার উন্নতির ওপর নির্ভর করছে। বিশ্ব রাজনীতি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন
নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, মস্কোর হাসপাতাল থেকে ফিরে তিনি পুনরায় জনসমক্ষে কবে
উপস্থিত হন এবং কীভাবে ইরানের ভঙ্গুর নেতৃত্বকে সামাল দেন। সব মিলিয়ে মোজতবা
খামেনির বর্তমান পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক গভীর অনিশ্চয়তার সৃষ্টি
করেছে।























