যুদ্ধবিরতির মধ্যেও লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি সেনারা। লেবানন ও
ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলেও সেখানে থেমে নেই অস্থিরতা। ইরানের
রাজধানী তেহরানেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একদিকে যেমন কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, অন্যদিকে পুরোপুরি থেমে
নেই সংঘাতও। দক্ষিণ লেবাননজুড়ে দিনভর বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে
টায়ার শহর থেকে এই বিকট শব্দগুলো পাওয়া যাচ্ছে।
ইসরায়েল শনিবার (২৫ এপ্রিল) লেবাননে ‘ইয়েলো লাইনে’ এর উত্তরে একাধিক স্থানে হামলা
চালিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, হিজবুল্লাহ এই স্থানগুলি রকেট নিক্ষেপের
কাজে ব্যবহার করছিল।
লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানো হলেও, এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ
করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন। তার মতে, এই চুক্তির
মাধ্যমে ইরান সমর্থিত হেজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত পুরোপুরি থামবে কি না,
তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড্যানন স্পষ্টভাবে
বলেছেন, ‘লেবানন সরকারের হিজবুল্লাহর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’
হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন করে রকেট হামলার অভিযোগও তুলেছে ইসরায়েল। ড্যানন অভিযোগ
করেন, ‘হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিকে ব্যাহত করতে রকেট হামলা চালাচ্ছে। আর ইসরায়েলকে
আত্মরক্ষার্থে পাল্টা জবাব দিতে হচ্ছে। আমরা যখনই কোনো হুমকি দেখছি, তখনই ব্যবস্থা
নিচ্ছি।’
হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলি
রাষ্ট্রদূতের বৈঠকের পর চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি আরও তিন সপ্তাহের জন্য বাড়ানোর
ঘোষণা দেওয়া হয়।
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৬
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া আহত
হয়েছে আরও দুজন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময়
বৃহস্পতিবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ তিন সপ্তাহ বাড়ানোর পরদিন শুক্রবার এ হামলা চালায়
দখলদার বাহিনী।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ওয়াদি আল-হুজাইরে দুইজন,
টৌলিনে দুইজন এবং স্রিফা ও ইয়াতের এলাকায় একজন করে নিহত হয়েছেন।
এদিকে, লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী (ইউএনআইএফআইএল) জানিয়েছে, ২৯ মার্চ
তাদের ঘাঁটিতে হামলায় আহত এক ইন্দোনেশিয়ান শান্তিরক্ষী শুক্রবার হাসপাতালে মারা
গেছেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ওই হামলায় একটি ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলা ব্যবহৃত
হয়েছিল।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননের বিন্ত জবেইল শহরে তারা
ছয়জন হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। তবে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের
ঘোষণায় উল্লেখিত নিহতদের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক আছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়।
উল্লেখ্য, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত লেবাননে মোট ২ হাজার
৪৯১ জন নিহত হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ল তিন সপ্তাহ
হোয়াইট হাউসে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পর্যায়ের এক বৈঠকের পর লেবানন ও ইসরায়েল তাদের
যুদ্ধবিরতি তিন সপ্তাহ বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড
ট্রাম্প। তিনি ওভাল অফিসে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লাইতার ও
যুক্তরাষ্ট্রে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা মোয়াওয়াদের মধ্যে দ্বিতীয় দফার বৈঠকের
আয়োজন করেন। দুই রাষ্ট্রদূতের আগের বৈঠকও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হয়েছিল, যেখানে
১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। ওই বিরতি রোববার শেষ হওয়ার কথা।
তার আগেই বৃহস্পতিবার ওই বিরতির মেয়াদ তিন সপ্তাহ বাড়ল। প্রথম দফা যুদ্ধবিরতির
মধ্যেও লেবাননে ইসরায়েল একাধিক হামলা চালিয়েছে; বুধবারই তাদের হামলায় এক সাংবাদিকসহ
অন্তত ৫ জন নিহতও হয়।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া লেবাননের ইরান-সমর্থিত রাজনৈতিক-সামরিক
গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ওভাল অফিসের বৈঠকে ছিল না। ইসরায়েলি বাহিনীকে ‘দখলদার’ আখ্যা
দিয়ে তারা বলছে, ‘দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার’ অধিকার তাদের রয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, নিকট ভবিষ্যতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনকে আতিথেয়তা দিতে তিনি মুখিয়ে আছেন। বৈঠকে
অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে নিয়ে ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে মার্কিন
প্রেসিডেন্ট বলেন, তিন সপ্তাহের বিরতি চলাকালে লেবানন ও ইসরায়েলের নেতারা আরও বসবেন
বলে তিনি আশা করছেন।
‘দুই দেশ এ বছরই একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাবে এমন চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে,’ বলেছেন
তিনি।
বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও,
ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকেবি ও লেবাননে মার্কিন রাষ্ট্রদূত
মিশেল ইসাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রথম দফার যুদ্ধবিরতির কারণে লেবাননে সহিংসতার পরিমাণ অনেকখানি কমলেও দেশটির
দক্ষিণে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত ছিল। ওই এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী স্বঘোষিত একটি
‘বাফার জোনের’ দখলও নিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে বৈঠকে যাওয়া রাষ্ট্রদূত
মোয়াওয়াদ বৈঠক আয়োজনের জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেছেন, ‘আপনার সহায়তা,
সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা আবার লেবাননকে মহান বানাতে পারব।’
লেবাননের এক কর্মকর্তা এর আগে বলেছিলেন, আলোচনার পরের ধাপে তারা লেবানন ইসরায়েলি
সেনা প্রত্যাহার, ইসরায়েলে আটক লেবাননের নাগরিকদের দেশে ফেরানো ও স্থলসীমান্ত
চিহ্নিত করার দাবি আদায়ের চেষ্টা করবেন।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহর ব্যাপারে লেবানন সরকারের সঙ্গে এক জায়গায় দাঁড়াতে চাইছে তেল
আবিব। গত এক বছর ধরে বৈরুত শান্তিপূর্ণ উপায়ে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে চেষ্টা
চালিয়ে গেছে।
ওভাল অফিসে বৈঠকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত লাইতার বলেছেন, হিজবুল্লাহকে নির্মূল কীভাবে
করা যায়, আলোচনায় সে ব্যাপারে প্রাধান্য দিতে হবে, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নয়।
‘হিজবুল্লাহ ও আইআরজিসির চরদের সঙ্গে যদি খুবই কোমল আচরণ করা অব্যাহত থাকে তাহলে
আমাদের পারস্পরিক অভিন্ন লক্ষ্য অর্জন অসম্ভবই থেকে যাবে,’ লাইতার এমনটাই বলেছেন
বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটনের ইসরায়েল দূতাবাস।























